আমেরিকা প্রবাসী লেখক উম্মু আবদুল্লাহ র বুয়েটের রাজনীতি সম্পর্কের লেখাটি পড়ুন...
বুয়েটে আমার দেখা রাজনীতি
-উম্মু আবদুল্লাহ
রাজনীতির সাথে আমার প্রথম পরিচয় বুয়েট জীবনে। এখানেই জীবনে প্রথম সক্রিয় রাজনীতি প্রত্যক্ষ করি। আমার সময়টা ৯০-৯৫ সালের। ক্লাশ শুরু হয় ৯০ এর একেবারে শেষের দিকে। সে সময়টা এরশাদ পতনের আন্দোলনের জন্য বিখ্যাত। বুয়েটেও চলছিল সক্রিয় আন্দোলন। ফলে সেসময় বুয়েটের বাতাস ছিল রাজনীতির আমেজ ক্লিষ্ট। তাই রাজনীতির ব্যপারে আমি অনাগ্রহী হলেও রাজনীতির অনেক টুকরো ঘটনা স্মৃতিতে ঠাই করে নিয়েছে দৃঢ়ভাবে।
বুয়েটে ক্লাশ শুরু হতেই নূতন ছাত্র/ছাত্রীদের মনোযোগ পাওয়ার জন্য ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্নরকম নবীন বরন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকত। কোন কোন অনুষ্ঠানে ছাত্র/ছাত্রীরা নিজেরা প্রোগ্রাম করত। আবার কখনও কখনও ব্যান্ড নিয়ে আসত। আমাদের সময়টাতে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এতটা প্রকট ছিল না। সংগঠনগুলোর কর্মীরা চাদা তুলে এসব প্রোগ্রামের আয়োজন করত। কেন্দ্র থেকে খুব বেশী সাহায্য পাওয়া যেত না। যাবে কি করে, তখন চলছিলো এরশাদের সামরিক শাসন। দলগুলোর আর্থিক অবস্থা ছিল বেশ নাজুক।
ব্যক্তিগত ভাবে রাজনীতির খবরাখবর নিয়মিত রাখলেও বুয়েটের ছাত্র রাজনীতি আমাকে কখনই আকর্ষন করে নি। আমি বুয়েটে ভর্তি হবার পর পর সেবারের ইউকসু ইলেকশনটা বেশ গুরুত্বপূর্ন ছিল। ভর্তি হলেও তখনো আমরা ক্লাশ শুরু করিনি। পত্রিকায় পড়তাম সব খবর। ৯০ এর আন্দোলনের পিক অবস্থা চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের নির্বাচনের ফল বেশ গুরুত্ব বহন করছে তখনকার জাতীয় রাজনীতিতে। এদিকে বি এন পি, জামাত ছাড়া বাকী রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এক হয়েছে। ফলে বি এন পি পড়েছে কিছুটা বেকায়দায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজে শক্ত অবস্থান সত্ত্বেও ছাত্র দল হেরেছে সংগ্রাম পরিষদের কাছে। ডাকসুতেও ছাত্রদলের পরাজয়। তবে ভাল সাংগঠনিক ভিত্তি থাকার ফলে বি এন পির বেশ সম্মানজনক পরাজয় হয়েছিলো। কিন্তু তা হলেও পরাজয় তো পরাজয়ই। ইউকসু ইলেকশন সেবারে তাই ছিল অস্তিত্বের লড়াই।
এরই মধ্যে হল ইউকসু নির্বাচন। বি এন পির দুর্গ বলে খ্যাত বুয়েট খালেদা জিয়াকে এনে দিল আস্থা। সাতটির মধ্যে চারটি সংগ্রাম পরিষদ নিয়ে নিলেও প্রেস্টিজিয়াস ভিপি সহ তিনটি ধরে রাখে বি এন পি। ভিপি হন ছাত্রদলের সাগর। এই নির্বাচনের ফল খালেদা জিয়াকে করে তোলে আস্থাশীল।
এর পরের রাজনীতির ইতিহাস কি মনে আছে আপনাদের? সেই ৯০ এর কথা? ছাত্রী মিছিলে হামলা, ডা: মিলন হত্যা, প্রতিদ্বন্দী হত্যাসহ বিভিন্ন কুকর্মের কুখ্যাত অভি নীরু বাহিনীকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঢাবি থেকে তাড়া খেয়ে তারা আশ্রয় নেয় বুয়েটের হলগুলোতে। কি যে ভয়ংকর অবস্থা। ছেলেগুলো থাকে আতংকে অস্থির। দেখে আমরাও আতংকিত হয়ে যাই। বুয়েট তখন অত্যন্ত নাজুক অবস্থায়। প্রতিদিনই মিছিল হচ্ছে। কে কখন গুলিবিদ্ধ হয় কে জানে। সেটা জেনেও সবাই মিছিলে যায়। টিচাররা কালো ব্যাজ পড়ে ক্লাশ নেন। বুয়েটে ক্লোজড সাইন ডাই হয়েছে কয়েকবার। মুহুর্তের মধ্যে হল খালি করতে বলা হয়। সেবার মেয়েদের কি অবস্থা। কয়েক ঘন্টার নোটিশ দিয়ে হল খালি করতে বলা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা সব জায়গায় উন্নত ছিল না। খুব কষ্ট হয়েছে অনেকের নিজের বাড়ী যেতে।
এরশাদ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। প্রান ফিরে আসে ক্যাম্পাসে। ১৪ মাসে আমরা শেষ করি ফার্স্ট ইয়ার। কয়েক মাস ছিল বন্ধ। যা আমরা এরশাদ ভ্যাকেশন নাম দিয়েছিলাম। সেকেন্ড ইয়ারে আবার শুরু হয় ইউকসু নির্বাচনের বাজনা। প্রতিদ্বন্দী ছাত্র সংগঠন গুলো মেতে উঠে রাজনৈতিক প্রচারনায়।
এর মধ্যে ঘটে যায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা। বুয়েটে ইউকসুর ভিপি সহ সাতজন পানিতে ডুবে মারা যায়। তার ফলে বুয়েটে বেশ কিছু দিন ছুটি পাই। বি এন পির রুহুল ভাই ক্যাম্পাসে খুব প্রিয় মুখ ছিলেন। ভূপেন হাজারিকার গান গাইতেন। আমি এখনও তাকে মনে করতে পারছি। তিনি স্টেজে গান গাইছেন, \"গংগা তুমি বইছ কেন?\" তার মৃত্যু সবাইকে বেশ নাড়া দেয়। সব ছাত্র সংগঠনের সবাই মিলে স্মরনিকা বের করে। তার মৃত্যু বুয়েটের একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা।
এর পরবর্তী ইউকসু নির্বাচনে হয়ত বা সিম্প্যাথি ফ্যাক্টর কাজ করে থাকবে এই শোকাবহ ঘটনা। ছাত্রদল আশাতীত ভাল করে ইউকসুতে। এক এজিএস পদটা ইউনিয়নের টিটুভাই নিয়ে যান। বাকী ৬টি সহ হল সংসদের প্রায় অধিকাংশ ছাত্রদলের দখলে। ছাত্রী হলেও বি এন পি খুব ভাল করেছিল। অথচ ছাত্রী হল মূলত ইউনিয়ন বেসড। আর টিটু ভাই এর ব্যক্তি ইমেজ ছিল বেশ ভারী। তিনি অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত, মেধাবী। ব্যক্তি ইমেজই তার সাফল্যের কারন বলে আমার বিশ্বাস।
বুয়েটে যে ছাত্র সংগঠনটির অবস্থা ছিল সবচেয়ে নাজুক - তা ছিল ছাত্র লীগ। কোন মেধাবী, বাগ্মী, যোগ্য ছাত্রকে এই সংগঠন করতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী আবার ছাত্রলীগের অনুসারী। সে তখন তার সমস্ত প্রতিভা খরচ করে ছাত্র লীগের উন্নয়নের জন্য। ছাত্রলীগের মিছিলগুলোতে সবার আগে সে এবং আরেকটা বান্ধবী থাকত। আমরা তিন তলা থেকে দেখতাম। আর সবচেয়ে যেটা মজা লেগেছিলো তা হল ইলেকশনের সময় ছেলেদের হলে গিয়ে তার ফুল দিয়ে সবাইকে অভ্যর্থনা দেয়া। বুয়েটের রক্ষনশীল পরিবেশে কিছুটা হলেও তা নিয়ে কথা উঠেছে। আর সে নিজেও বেশ রক্ষনশীল। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শের জন্য মানুষ অনেক কিছু করতে পারে। তার এত ত্যাগের ফলে বুয়েটে ছাত্র লীগ কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল। ড্রাগ এডিক্ট সর্বস্ব দল বলে মনে হত না আর।
ছাত্র লীগকে বুয়েটের দুর্বলতম ছাত্র সংগঠন বলে উল্লেখ করেছি। এতে কোন ভুল আছে বলে মনে করি না। একমাত্র সংখ্যালঘু কিছু ছাত্র ব্যতীত সাধারন ছাত্রদের মাঝে লীগের কোন জনপ্রিয়তা কখনও দেখিনি। যে জনপ্রিয়তা ইউনিয়ন, ছাত্রদল, এমন কি জাসদের পর্যন্ত ছিল। তবে ছাত্র লীগের একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপের কথা স্মৃতিতে অম্লান। সে ঘটনা ছাত্রলীগকে লাইম লাইটে নিয়ে এসেছিলো। তখন বুয়েটে কনভোকেশনের আয়োজন চলছে। স্মরনকালের প্রথম কনভোকেশন। বেশ বড় সড় আয়োজন। প্রেসিডেন্ট আসবেন। সবাইকে সার্টিফিকেট দেবেন। এই কনভোকেশনের সময় প্রেসিডেন্টের বুয়েট সফরকে কেন্দ্র করে শুরু হল ক্যাম্পাসে ছাত্র লীগের প্রতিবাদ মিছিল, আন্দোলন।তাদের দাবী রাজাকার রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে প্রতিহত করতে হবে। নইলে কনভোকেশন করতে দেয়া হবে না। আমরা রুদ্ধ শ্বাসে অপেক্ষা করছি কি হয় দেখার জন্য। সত্যিই কি কনভোকেশন পন্ড হবে? না, তা হয় নি শেষ পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস আসেন নি। বুয়েট কর্তৃপক্ষের অনুরোধে কনভোকেশনে প্রধান অতিথি হন খালেদা জিয়া। বুয়েট কর্তৃপক্ষ কনভোকেশন নিয়ে কোন ঝামেলায় জড়াতে চান নি। আর এদিকে রাজাকার প্রেসিডেন্টকে প্রতিহত করার কৃতিত্ব দাবী করে ছাত্রলীগ বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা চালায়। সেসময়টা ক্যাম্পাসে লীগের কর্মকান্ড ছিল চোখে পড়ার মত।
আগেই বলেছি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতৃত্বই ইউকসুতে বেশী সংখ্যায় প্রতিনিধিত্ব করেছে। তবে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নিয়ে স্ক্যান্ডাল একেবারে কম ছিল না। বিশেষত এক বি এন পি সাংসদের নামে স্ক্যান্ডাল শুনেছিলাম সে নাকি টেন্ডারের হিসাব মেলাতে পারছিল না। যার ফলে কতৃপক্ষ তার সার্টিফিকেট আটকে দেয়। পরে হিসাব মেলানোর পর তার ডিগ্রি দেয়া হয়। এটা শুনে আমার বেশ অবাক লেগেছিল। উনাকে আমি দেখেছিলাম বেশ ভদ্র হিসেবে। এত ভদ্র একজনের বিরুদ্ধে কি করে এমন অভিযোগ উঠতে পারে?
বুয়েটের শক্ত প্রশাসনের কারনে ভাংচুরের রাজনীতি খুব বেশী হতে পারে নি কখনই। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা আছে। শিবিরের কিছু ছেলের বিছানা বই পোড়ানো হয়েছে। যেটা বুয়েটের জন্য লজ্জাকর। সব সময় এসব ঘটনার সঠিক বিচার করা সম্ভব নয়। কিছু ঘটনা বিচারের বাইরে রয়ে যায়।
আরো অনেক কিছুই মনে পড়ছে এখন। মনে পড়ছে বুয়েটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গুলোর কথা। ইউকসুর সার্থকতা এখানে। বেশ ভাল রকম প্রোগ্রাম করত ইউকসু। একবার কোন এক প্রোগ্রামে নূরুল উলা স্যার এসেছিলেন। প্রোগ্রামটা অবশ্য ইউকসুর ছিল কিনা তা মনে করতে পারছি না। তিনি মুক্তিযোদ্ধা এবং সেই অভিজ্ঞতার বলছিলেন। তার এক ফাকে তিনি বুয়েটের পরিবেশের বেশ প্রশংসা করছিলেন। ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পর যখন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে দালাল ধর দালাল মার দালাল খোজ এরকম অভিযান চলছে, তখন বুয়েট নাকি একদম শান্ত। বুয়েটে পাকিস্তানপন্থীরা কখনই মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষকদের বিরক্ত করে নি, আবার উনারাও কখনও পাকিস্তানপন্থীদের উপর চড়াও হন নি। বুয়েটের এই পরিবেশ সব সময়ই সমঝোতাপূর্ন।
রাজনীতি থেকে দূরে থাকাটাই আমি পছন্দ করেছি সারা জীবন। তবুও ছাত্র সংগঠন গুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে যখন বিভিন্ন ব্যান্ড দল ভাড়া করত, তখন আমিও যেতাম বুয়েট অডিটোরিয়ামে। সেই আলো আধারি পরিবেশে ব্যান্ডগুলোর গান শুনতে খুব ভাল লাগত। যত শক্তিশালী সংগঠন তত নামকরা ব্যান্ড আনা হত। ছাত্র দলের পক্ষে বেশ বড় আয়োজন সম্ভব হত। ফিড ব্যাকের মাকসুদ ছিল একটা আকর্ষন। আমার কাছে আবার তাকে অসহ্য লাগত। কিন্তু তার প্রোগ্রাম বুয়েটে খুব জনপ্রিয় ছিল। আমি অবশ্য তওবা কেটে থার্ড ইয়ার থেকে আর কোন ব্যান্ডের প্রোগ্রামে যাই নি। তখন থেকে গান শোনা, টিভি দেখা খুব কমিয়ে দেই।
শেষ একটি স্মৃতি কথা দিয়ে ইতি টানছি আমার বুয়েট রাজনীতি বিষয়ক স্মৃতিচারন। বুয়েটে শক্ত প্রশাসনের মাঝেও শিবির বিরোধিতা কিছু কম ছিল না। শিবিরকে কোন কর্মকান্ড চালাতে দিত না বামপন্থী ছাত্ররা। তো সেরকম একজন বামপন্থী ছেলে ছিল আবার আমার ক্লাশের। সে শিবির বিরোধিতার জন্য বিখ্যাত ছিল। তার ফলে শিবির কর্মীরা সবাই তাকে ভাল মত চিনত। বুয়েট শেষে পরবর্তীতে ছেলেটার বিয়ে হয় আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর বোনের সাথে। সেই বান্ধবী আর তার বোনের ফ্যামিলি আবার মোল্লা টাইপ। জামাত ঘেষা হতে পারে, আমি ততটা জানি না। ঘটনাক্রমে একবার সেই বান্ধবীর বাসায় আবার ছেলেটির সাথে দেখা হয় আমার। দেখি সে পুরো অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। অসম্ভব ধার্মিক হয়েছে। শিবিরের প্রতি পুরোনো বিরূপভাব তেমন একটা নেই। অনেক সহনশীল হয়েছে। এদিকে সেই আসরে আবার উপস্থিত ছিলেন তখনকার সময়ের বুয়েটের শিবিরের প্রেসিডেন্ট। তিনিও ভালই চিনতেন এই ছেলেকে। আমি উনাকে জানালাম ছেলেটির অভাবনীয় পরিবর্তনের কথা। আমার মত উনিও খুব অবাক হয়েছিলেন। এরকম পরিবর্তন খুব অপ্রত্যাশিত। মানুষ যে কিভাবে বদলায় তা দেখলে হতভম্ব হতে হয়। মানুষ আল্লাহর এক অদ্ভূত সৃষ্টি।
অনেক ঘটনার থেকে এই কয়টি তুলে দিলাম আজ। বাকীগুলো পরে হবে।
লেখক, আমেরিকা প্রবাসী
Friday, October 17, 2008
Subscribe to:
Comments (Atom)
